• শুক্রবার   ১৯ আগস্ট ২০২২ ||

  • ভাদ্র ৪ ১৪২৯

  • || ২০ মুহররম ১৪৪৪

সর্বশেষ:
এদেশের মাটিতে সবার সমান অধিকার: প্রধানমন্ত্রী নীলফামারীতে অপহৃত কিশোর উদ্ধার, আটক ৩ দিনের তাপমাত্রা কমবে ১ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার সক্ষমতা আছে বাংলাদেশের মেট্রোরেলের স্টেশনের কাজ প্রায় শেষ

পাকিস্তানকে গণহত্যা ও যুদ্ধের দায় শোধ করতে হবে

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ২৫ মার্চ ২০২২  

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)  

বছর ঘুরে আবার ২৫শে মার্চ এসেছে। একাত্তরের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী মানবসভ্যতার ইতিহাসে নজিরবিহীন গণহত্যা শুরু করে। অপারেশন সার্চলাইট ভয়ংকর এক গণহত্যার অকাট্য দলিল। ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে পাকিস্তানি অফিসার ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিক তাঁর নিজের রচিত ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থের ৭২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, একটি রক্তাক্ত গণহত্যার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি ছিল একদম পারফেক্ট, অর্থাৎ সুনিপুণ।

এই গণত্যার অন্যতম কালপ্রিট ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তানের ১৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা নিজের লিখিত ‘আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, ‘আমরা পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করেছি এবং জনগণ যখন ন্যায্য দাবি আদায়ে সংঘবদ্ধ হয়েছে তখন আমরা গণহত্যার পথ বেছে নিয়েছি।’

পাকিস্তান সেনাবাহিনী সামরিক অভিযান শুরু করার পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাই জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী পাকিস্তান এ ক্ষেত্রে আগ্রাসী এবং প্রথম আক্রমণকারী দেশ। সুতরাং কনভেনশন অনুযায়ী এই যুদ্ধের সব দায়-দায়িত্ব বর্তায় পাকিস্তানের ওপর। পাকিস্তান সেনা অভিযানের কোড নেম বা সংকেতিক নাম দেয় অপারেশন সার্চলাইট। অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম পর্বের প্রথম রাতে (২৫শে মার্চ রাত) তারা অভিযান চালায় ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর ও সিলেট শহরে। অর্থাৎ ওই সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থানকৃত শহরগুলো তারা প্রথম টার্গেট হিসেবে বেছে নেয়। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, এক রাতেই তারা প্রায় এক লাখ নিরীহ, বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে। সার্চলাইটের প্রথম পর্বের দ্বিতীয় অংশে তারা পুরো বাংলাদেশের সব শহর, বন্দর, ব্যবসাকেন্দ্র ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুগুলো দখল ও নিয়ন্ত্রণে নেয়, যা করতে গিয়ে তারা নির্বিচারে জ্বালা-পোড়াও, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটসহ সীমাহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

অপারেশন সার্চলাইটের দ্বিতীয় পর্বে তারা পুরো বাংলাদেশের ওপর দখলদারি বজায় রেখে প্রতিনিয়ত হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াও, লুটপাট চালিয়েছে এবং শেষ মুহূর্তে এসে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। গভর্নরের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ছিলেন ঢাকা শহরের দায়িত্বে, আর ১৪ পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ছিলেন ঢাকা ব্যতীত পুরো বাংলাদেশের দায়িত্বে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হামিদ খান ১৭ মার্চ খাদিম হোসেন রাজাকে সার্চলাইটের আদেশনামা চূড়ান্ত করার হুকুম দেন। খাদিম হোসেন রাজা ও রাও ফরমান আলী ১৮ মার্চ একত্রে ঢাকা সেনানিবাসে বসে অপারেশনের আদেশনামা চূড়ান্ত করেন। এখানে উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে পরামর্শের পর পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের জন্য সেনাপ্রধান হামিদ খানকে প্রস্তুত হতে বলেন। জেনারেল হামিদ খান এবং পূর্ব পাকিস্তানের নতুন গভর্নর ও সামরিক প্রধান জেনারেল টিক্কা খান একত্রে ২০ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের অনুমোদন দেন। গণহত্যা পরিকল্পনার প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ গুল হাসান।

সার্চলাইটের আদেশনামায় রাও ফরমান আলী সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেট উল্লেখপূর্বক আদেশ দেন কোন সেনাদল ঢাকার কোথায় অভিযান চালাবে। আদেশনামায় টার্গেট হিসেবে উল্লেখ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করা হয় ইকবাল হল, জগন্নাথ হল, ঢাকা হল এবং শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা। ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একইভাবে অন্যান্য সেনাদলকে আলাদাভাবে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসকে টার্গেট হিসেবে নির্দিষ্ট করে আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণীয় বিষয় হলো, লিখিত সামরিক অপারেশন আদেশনামায় বেসামরিক এলাকা ও মানুষকে টার্গেট হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেবসহ এক ডজনের ওপর শিক্ষক এবং কয়েক শ ছাত্রকে হত্যা করা হয়।

একই রাতে শাঁখারীবাজারে নিহত হয় প্রায় আট হাজার মানুষ। চকবাজারসহ ঢাকা শহরের অন্যান্য এলাকায়ও একই ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। পুরান ঢাকায় প্রধানত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে টার্গেট করা হয়। ঘুমন্ত নারী, শিশুসহ ঘরবাড়িতে গানপাউডারের মাধ্যমে আগুন দেওয়া হয়। বুড়িগঙ্গার ওপার থেকে সারা রাত দাউদাউ করে পুরান ঢাকায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ২৫শে মার্চের নৃশংস গণহত্যার সচিত্র প্রতিবেদন বিশ্ব মিডিয়াতেও প্রকাশিত হয়। ৩১ মার্চ সাইমন ড্রিং ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ‘নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ সব ধরনের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করে। ইকবাল হলকে তারা প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেয়। হলগুলোর ওপর একদিকে উপর্যুপরি ভারী কামানের শেল নিক্ষেপ করা হতে থাকে, অন্যদিকে চলতে থাকে মেশিনগানের গুলি। শুধু ইকবাল হলেই প্রথম ধাক্কায় ২০০ জন ছাত্র নিহত হয়। দুই দিন পর্যন্ত পোড়া ঘরগুলোর জানালায় মৃতদেহ ঝুলে থাকতে দেখা যায়। ’

বেসামরিক মানুষের ওপর এমন সমন্বিত অস্ত্রের ব্যবহার বিশ্বে আর কোথাও হয়নি। যুদ্ধ সম্পর্কে জাতিসংঘের জেনেভা কনভেনশনের প্রারম্ভে বলা হয়েছে, যুদ্ধেরও একটা সীমা আছে, বেসামরিক মানুষকে কখনো টার্গেট করা যাবে না। তারপর জেনেভা কনভেনশনে যুদ্ধরত বাহিনীকে ১০টি রুলস বা বিধি মান্য করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে, সেখানে তিনটি বিধির মাধ্যমে বিশেষভাবে বেসামরিক মানুষের জন্য রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়েছে। তার মধ্যে ১ নম্বরে বলা হয়েছে, বেসামরিক মানুষকে টার্গেট করা থেকে বিরত থাকুন, সেটা করা মানে স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ। যুদ্ধের পর পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অনেক চেষ্টা করেও গণহত্যার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ধামাচাপা দিতে পারেনি।

গণহত্যার অন্যতম ঠাণ্ডা মাথার পরিকল্পনাকারী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী নিজের গা বাঁচানোর জন্য তদন্ত কমিটির কাছে বলেছেন, লে. কর্নেল ইয়াকুব মালিকের নির্দেশে ১৯৭১ সালের ২৭ ও ২৮ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসে বাঙালি অফিসারসহ ১৯৫ জন নিরীহ মানুষকে স্রেফ জবাই করা হয়। সালদা নদীর এলাকায় লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ৫০০ জনকে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। একজন ব্রিগেড কমান্ডার, ব্রিগেডিয়ার ইকবালুর রহমান তাঁর জবানবন্দিতে বলেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল গুল হাসান পূর্ব পাকিস্তানের সেনা ইউনিট পরিদর্শনের সময় সৈনিকদের জিজ্ঞাসা করতেন, ‘তুমি কয়জন বাঙালিকে মেরেছ’ এবং আরেকজন অফিসার লে. কর্নেল আজিজ আহমদ খান সাক্ষ্যে বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে তাঁর ইউনিটে গিয়ে জেনারেল নিয়াজি জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমরা কত হিন্দু মেরেছ?’

জেনারেল নিয়াজি তাঁর নিজের লেখা ‘দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘জেনারেল টিক্কা খান তাঁকে বলছিলেন, আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না। ’ নিয়াজি তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘টিক্কা খান পোড়ামাটিনীতি গ্রহণ করেন এবং সে অনুসারে জেনারেল রাও ফরমান আলী ও ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব হুকুম পালন করেন। ’ ফরমান আলী তাঁর টেবিলের ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ ভূমি বাঙালির রক্তে লাল করা হবে। ’

পাকিস্তান সেনাবাহিনী শুধু গণহত্যা নয়, পুরো ৯ মাস তারা পূর্ব পাকিস্তানে পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ধর্ষণকে তারা যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। গাছপালা, বন-জঙ্গল, গবাদি পশু পর্যন্ত তাদের ধ্বংসযজ্ঞ ও বর্বরতা থেকে রক্ষা পায়নি। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচার যেমন হতে হবে, তেমনি এই বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের দায় পাকিস্তানকে বহন করতে হবে, যথাযোগ্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। উল্লিখিত সব অপকর্মে পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করেছেন বাংলাদেশের জামায়াত, মুসলিম লীগ, শান্তি কমিটি ও রাজাকার, আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। তাঁরা যদি পাকিস্তানিদের গাইড না হতেন, গ্রামগঞ্জের পথ না দেখাতেন—তাহলে এত সহজে পাকিস্তানিরা এত বড় বর্বরতা চালাতে পারত না। তাই জামায়াত, মুসলিম লীগসহ যাঁরা পাকিস্তানি বর্বরতা ও ধ্বংসযজ্ঞের সহযোগী ছিলেন, বাংলাদেশে তাঁদের সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের নামে বাজেয়াপ্ত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে দেশের ভেতর এমন বিশ্বাসঘাতক ও কুলাঙ্গারের জন্ম না হয়।

প্রধানত দুটি কারণে পাকিস্তান দায় এড়াতে পারবে না। প্রথমত, এই যুদ্ধে স্পষ্টতই পাকিস্তান আগ্রাসী রাষ্ট্র। কারণ সম্পূর্ণ অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে তারাই প্রথম যুদ্ধ ঘোষণা এবং শুরু করেছে। আমরা বাংলাদেশের মানুষ বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলি এবং আক্রমণকারী দখলদার বাহিনীকে পরাস্ত করে দেশ স্বাধীন করি। দ্বিতীয়ত, বিনা উসকানিতে হাজার হাজার গ্রামগঞ্জে নিরস্ত্র-নিরীহ মানুষকে হত্যা এবং তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়। সুতরাং এটাকে কোলেটারাল ড্যামেজ বা যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ক্ষতি বলার কোনো সুযোগ নেই। তাই আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী আক্রমণকারী দেশ পাকিস্তানকে যুদ্ধের সব দায় বহন এবং তা পরিশোধ করতে হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে প্রথম আক্রমণকারীকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

অপারেশন সার্চলাইটের আদেশনামা, পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের লিখিত স্বীকারোক্তি এবং অন্যান্য দলিল, যার কথা আমি উল্লেখ করেছি—সেগুলোই পাকিস্তানের দায় প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট। অতিরিক্ত সাক্ষী-সাবুদের খুব একটা প্রয়োজন হবে না। তাই গণহত্যার বিচার হতে হবে এবং যুদ্ধের সব দায় পাকিস্তানকে পরিশোধ করতে হবে। এই প্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষ কোনো ছাড় দেবে না।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected] 

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –