• শুক্রবার   ২০ মে ২০২২ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৫ ১৪২৯

  • || ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩

সর্বশেষ:
শ্বশুরবাড়িতে জামাইয়ের গলাকাটা লাশ ভুরুঙ্গামারীতে কালবৈশাখী তাণ্ডবে দুই শতাধিক বসতবাড়ি লণ্ডভণ্ড রংপুর চিড়িয়াখানা থেকে তিন হরিণ বিক্রি

শিক্ষার সহযাত্রায় ইসলামী সভ্যতার বিকাশ

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ৬ জানুয়ারি ২০২২  

‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে’ প্রত্যাদেশের মাধ্যমে পৃথিবীতে শুরু হয়েছিল ইসলামের পথচলা। ফলে শিক্ষার সহযাত্রায় বিকাশ ঘটেছিল ইসলামী সভ্যতার। মক্কার চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও রাসুলুল্লাহ (সা.) আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িতে ইসলামের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। মদিনায় হিজরতের পর মদিনায় মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে ‘সুফফা’ নামক একটি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘সুফফা’-ই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

দ্বিতীয় হিজরিতে শুধু পরিবর্তনের পর মসজিদে নববীর দক্ষিণপাশে প্রথম কিবলার দিকটিতে দেয়াল তোলা হয় এবং ওপরে চাল দিয়ে সেখানে জ্ঞানপিপাসু সাহাবি এবং দরিদ্র ও আশ্রয়হীন মানুষের সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। স্থানটি ছায়াবিশিষ্ট হওয়ায় সুফফা নামকরণ করা হয়। এখানের শিক্ষার্থী ও আশ্রয় গ্রহণকারীরা ইসলামের ইতিহাসে ‘আসহাবে সুফফা’ নামে পরিচিত। (সিরাতে মোস্তফা : ১/৪৪৪)

সুফফা ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হুজরাগুলোর নিকটবর্তী স্থানে। সুফফার অধিবাসীরা সাধারণত সারা দিন সেখানেই থাকত। কোরআনের আয়াত, নবীজি (সা.)-এর বাণীগুলো (হাদিস) শুনত এবং তা আত্মস্থ করত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের শরিয়তের বিধি-বিধান শেখাতেন। তিনি তাদের কখনো কখনো খাবারের জন্য নিজের ঘরে নিয়ে যেতেন। (মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস : ২/২৮)

ড. আলী মুহাম্মদ সাল্লাবি বলেন, ‘আহলে সুফফা মসজিদে অবস্থান করত ইবাদতের জন্য। তারা দারিদ্র্য ও আত্মত্যাগের জীবন পছন্দ করত। অবসর সময়ে তারা কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকির করত, পরস্পরকে লেখা শেখাত। এমনকি তাদের একজন উবাদা বিন সামিত (রা.)-কে নিজের ধনুক উপহার দেন। কেননা তিনি তাদের কোরআন ও লেখা শেখাতেন। সুফফাবাসী জিহাদে অংশগ্রহণ করত। তাদের ভেতরও বহু শহীদ আছে। তারা ছিল রাতের সাধক ও দিনের অশ্বারোহী (যোদ্ধা)।’ (আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, পৃষ্ঠা ৩০৫)

হিজরতের প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব সাহাবি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন তাঁদের বেশির ভাগকে আনসারি সাহাবিরা নিজেদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং যৌথভাবে তাঁদের ব্যয়ভার বহন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মুহাজির সাহাবিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে তাদের প্রাথমিকভাবে মসজিদে আশ্রয় দেওয়া হতো। অন্যত্র স্থানান্তর করার আগ পর্যন্ত তাঁরা সুফফাতে অবস্থান করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) তাঁদের সম্পর্কে বলেন, ‘সুফফার অধিবাসীরা ছিলেন ইসলামের মেহমান। তাঁদের পরিবার, সম্পদ বা অন্য কোনো আশ্রয় ছিল না।’ তবে সুফফায় অবস্থানকারীদের ভেতর বহুসংখ্যক এমন ছিলেন, যাঁরা দুনিয়াবিমুখতা, জ্ঞানসাধনা ও আত্মিক উন্নতির জন্য সেখানে অবস্থান করতেন, যদিও তাঁরা আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন এবং মদিনায় তাঁদের ঘর-বাড়ি ছিল। যেমন কা’ব বিন মালিক (রা.), হানজালা বিন আবু আমির (রা.), হারিসা বিন নোমান (রা.) প্রমুখ। (আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৩০৩-৩০৪)

আসহাবে সুফফার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লামা ইদরিস কান্ধলভি (রহ.) বলেন, ‘তাঁরা ছিলেন আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতার প্রতীক ও একনিষ্ঠ একটি দল। তাঁরা দিন-রাত আত্মশুদ্ধি ও কোরআন, হিকমত, বস্তু ও বিষয় সম্পর্কিত সূক্ষ্ম জ্ঞান শেখার জন্য নবী (সা.)-এর সেবায় উপস্থিত থাকতেন। এ ছাড়া না ছিল তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি আগ্রহ, না ছিল কৃষিকাজের প্রতি কোনো উৎসাহ।’ (সিরাতে মোস্তফা : ১/৪৪৫)

সুফফার শিক্ষার্থীরা জ্ঞানার্জনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেন। পানাহার থেকে শুরু করে তাদের জীবনের বহু মৌলিক প্রয়োজন অপূর্ণ থাকত। তারা কখনো কখনো ক্ষুধার যন্ত্রণায় মাটিতে গড়াগড়ি করতেন, যা দেখে পথচারীরা তাদের মৃগি রোগে আক্রান্ত মনে করত। আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনা থেকেও সুফফাবাসীর আত্মত্যাগের বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আমি ৭০ জন আসহাবে সুফফাকে দেখেছি। তাদের কারো গায়ে বড় চাদর ছিল না। হয়তো ছিল শুধু লুঙ্গি কিংবা ছোট চাদর, যা তারা তাদের ঘাড়ে বেঁধে রাখত। কারো নিসফে সাক বা হাঁটু পর্যন্ত আর কারো টাখনু পর্যন্ত ছিল। তারা লজ্জাস্থান দেখা যাওয়ার ভয়ে হাত দিয়ে ধরে রাখত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৪০)

সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর এই অসামান্য আত্মত্যাগ দেখে মহানবী (সা.) তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘যদি তোমরা জানতে আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য কী প্রস্তুত আছে, তাহলে তোমরা অবশ্যই কামনা করতে আমাদের দারিদ্র্য ও উপবাস থাকা আরো বেড়ে যাক।’ (হিলয়া : ১/২৩৯)

সুফফাবাসীর ব্যয়ভার ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগে পূরণ করা হতো। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘আমিও আসহাবে সুফফার একজন ছিলাম। যখন সন্ধ্যা হতো, আমরা সবাই নবী (সা.)-এর কাছে চলে যেতাম। তিনি একজন-দুজন করে ধনী সাহাবিদের কাছে সোপর্দ করতেন। যারা অবশিষ্ট থাকত তাদের তিনি নিজের সঙ্গে খাবারে শরিক করতেন। খাওয়ার পর আমরা রাতে মসজিদে ঘুমাতাম।’ এ ছাড়া মসজিদে নববীর দুটি খুঁটির মধ্যে একটি রশি বাঁধা থাকত। আনসার সাহাবিরা বাগান থেকে থোকা থোকা ফল এনে আসহাবে সুফফার জন্য তাতে ঝুলিয়ে রাখতেন। আসহাবে সুফফা তা লাঠি দ্বারা নামিয়ে খেতেন। মুয়াজ বিন জাবালের (রা.) ব্যবস্থাপনা ও দেখাশোনা করতেন। (সিরাতে মোস্তফা : ১/৪৪৮)

আসহাবে সুফফার সংখ্যা স্থিতিশীল ছিল না। কখনো তা বাড়ত আবার কখনো কমত। তবে তাদের সংখ্যা ৭০ জনের মতো থাকত। যেমনটি আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে। অন্য বর্ণনায় এসেছে সাআদ ইবনে উবাদা (রা.) একাই সুফফার ৮০ জনের আপ্যায়ন করে। তা থেকে বোঝা যায় আসহাবে সুফফার সংখ্যা কখনো কখনো বৃদ্ধিও পেত। এমনকি তাদের সংখ্যা ৪০০ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। আসহাবে সুফফার উল্লেখযোগ্য কয়েকজন সাহাবি হলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, আম্মার ইবনে ইয়াসার, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, মিকদাদ ইবনে আমর, খাব্বাব ইবনে আরাত, বেলাল ইবনে রাবাহ, সুহাইব ইবনে সিনান, আবু কাবশাহ, সাফওয়ান ইবনে বাইদা, মিসতাহ ইবনে উসাসা, উমায়ের ইবনে আউফ, আবু লুবাবা, আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস, আবু জর গিফারি, উতবা ইবনে মাসউদ, সালমান ফারেসি, হুজায়ফা ইবনুল ইয়ামান, আবু দারদা, আবু হুরায়রা, সাওবান, মুয়াজ বিন হারিস, সায়িব ইবনে খাল্লাদ, সাবিত ইবনে ওয়াদিয়া (রা.) প্রমুখ। (সিরাতে মোস্তফা : ১/৪৫১-৫২; আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৩০৬)

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –