• মঙ্গলবার   ১৯ অক্টোবর ২০২১ ||

  • কার্তিক ৪ ১৪২৮

  • || ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সর্বশেষ:
পীরগঞ্জের জেলেপল্লীতে আগুন: ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া সেই যুবক গ্রেফতার সারাদেশে আ’লীগের ‘সম্প্রীতি সমাবেশ-শান্তি শোভাযাত্রা’ কর্মসূচি সেবা খাতের আয় দেশে আনার পদ্ধতি আরো সহজ করলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশি ফলন, বন্যাসহনীয় আগাম আমন বীনা-১১ চাষে ঝুঁকছেন কৃষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মনিটর করছে পুলিশ, ‍গুজব ছড়ালেই ব্যবস্থা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান   

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২১  

আলী হাবিব 
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিধনযজ্ঞ থেকে রেহাই পেতে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। আশ্রয় নেয় কক্সবাজারে।  মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দেয়। কিন্তু এই আশ্রিত রোহিঙ্গারাই এখন দেশের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহানুভবতা দেখাতে গিয়ে বাংলাদেশ এখন নিজেই সংকটের মুখে পড়েছে।  আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় জনজীবনে নেমে এসেছে এক দুর্বিষহ অবস্থা। কঠিন পাহারা সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে রাখা যাচ্ছে না। কত রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। রোহিঙ্গাদের অনেকেই মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানসহ নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের নিজেদের মধ্যেও হানাহানি, খুনোখুনির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। আশ্রয়শিবিরগুলো হয়ে উঠেছে নানাবিধ অপরাধের আখড়া। গুম, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ- কোনো কিছুই বাদ নেই। বিশেষ করে রাতের বেলা ক্যাম্পগুলো চলে যায় সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দখলে। এ পর্যন্ত কয়েক শ ব্যক্তি গুম-অপহরণের শিকার হয়েছেন। এদের হাতে স্থানীয়রাও হত্যা-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবসন প্রসঙ্গে মিয়ানমারের নির্বাসিত সরকার জাতীয় ঐক্য সরকারের (ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট- এনইউজি) ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দুআ লাসি লা কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মিয়ানমারে কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের দায় পুরোপুরি ওই দেশের সামরিক বাহিনীর। প্রায় ছয় মাস আগে তারা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে, যে কারণে নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গার স্বদেশে ফিরে যাওয়া বর্তমান জান্তা সরকারের সময় সম্ভব হবে না। তিনি মনে করেন, যত দিন মিলিটারি কাউন্সিল (স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল) ক্ষমতায় আছে তত দিন এ ধরনের প্রত্যাবাসনের কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ সামরিক বাহিনী শরণার্থীদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাঁর মতে, জাতীয় ঐক্য সরকারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরকারই শুধু ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে।

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য যে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, কক্সবাজারের তুলনায় তা অনেক উন্নত ও নিরাপদ। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) স্ট্যান্ডার্ড মেনে ৩.৯ বর্গমিটার জায়গা রেখে সেখানে ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছে। ১২০টি ক্লাস্টারে থাকা ঘরগুলো এতটাই পাকাপোক্ত যে ২৬০ কিলোমিটার গতির ঝড়েও ঘরের কোনো ক্ষতি হবে না। তারপরও এসব ক্লাস্টারের সঙ্গে রয়েছে চার তলা একটি দুযোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র। রয়েছে ভূগর্ভস্থ পানি এবং পুকুর, হ্রদ ও খালের ব্যবস্থা। প্রতি ১১ জনে একটি টয়লেট ও ২০ জনে একটি বাথরম্নমসহ রয়েছে উন্নত সেনিটেশন ব্যবস্থা। আছে ডিজেল জেনারেটর ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা। রয়েছে বাজার, হাসপাতাল, ক্লিনিক, থানা, সুপারশপ, অফিস ও শেল্টার হাউস। পাশাপাশি আছে জীবিকা নির্বাহের নানা সুবিধা প্রায় তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে এই আবাসন উদ্যোগ গড়ে তোলা হয়েছে। অথচ রোহিঙ্গাদের সেখানে যেতে বাধা দিচ্ছে একটি গোষ্ঠী।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে প্রত্যাবাসন চুক্তি করেছিল, যদিও গত তিন বছরে এ বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। ২০১৮ সালের মধ্য নভেম্বরে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটি ফিরে যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করা হলেও তারা যেতে পারেনি। ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের দিন ধার্য করেও কার্যকর করা যায়নি। মিয়ানমারের যথাযথ প্রস্তুতি এবং কয়েকটি সংস্থার সহযোগিতার অভাবে ওই সময় প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তারপর মিয়ানমারে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে বিষয়টি অনেকটাই স্থবির হয়ে আছে। মিয়ানমার সব সময়ই প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার জন্য নানা ফন্দি-ফিকির করে আসছে। আজ পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছা বা আন্তরিকতার কোনো চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়নি। যদিও বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে এ আশাই পোষণ করে আসছে যে মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিক রোহিঙ্গাদের সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে নেবে।

বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) গড়িয়েছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চিকে আন্তর্জাতিক আদালতে তাঁর দেশকে সমর্থন করার জন্য দাঁড়াতে হয়েছে। যাই হোক, সামরিক জান্তা সু চিকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের (যা দৃশ্যমান) পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করায় প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। আশার যে ক্ষীণ আলোকরশ্মি ছিল, মিয়ানমারের সামরিক সরকার তা পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে। গাম্বিয়ার আনা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘটিত রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলায় চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আইসিজের এখতিয়ার নিয়ে মিয়ানমার প্রাথমিক আপত্তি জানিয়েছিল। অর্থাত্ ওই ঘটনাটি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের ঠিক দুই সপ্তাহ আগের। আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই আপত্তিতে মিয়ানমার উল্লিখিত মামলার শুনানি আইসিজে করতে পারে কি না এবং গাম্বিয়া মামলাটি আনতে পারে কি না, সেসব প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ওই মামলার প্রাথমিক শুনানির সময় অং সান সু চি আন্তর্জাতিক আদালতেও অনুরূপ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন।

বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মহল এই সংকট সমাধানের জন্য এখন পর্যন্ত যেসব প্রচেষ্টা চালিয়েছে। দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এখনো চাপ অব্যাহত রয়েছে। চীন ও ভারত, যারা বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ের গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রতিবেশী এবং বন্ধু, যদি আন্তরিকভাবে ইচ্ছা করে, তবে একটি ইতিবাচক ফলাফল ঘটাতে পারে। দুর্ভাগ্যক্রমে যদিও আমরা সব সময় প্রত্যাশা করে আসছি, সমস্যাটি সমাধানে এই দুই দেশের ইচ্ছা বা প্রতিশ্রুতির যে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বসম্প্রদায় থেকে যে উদ্যোগ বা প্রতিশ্রুতির কথা শোনা গেছে তা সাধারণ কূটনৈতিক মানদণ্ড ও অনুশীলনের অংশ ছাড়া আর কিছু বেশি বলে মনে করেন না বিশেষজ্ঞমহল। কূটনীতিকদের মতে, তারা সাহায্য, সহায়তাসহ বিভিন্ন উপায়ে রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে হয়তো বাংলাদেশকে খুশি করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। অন্যদিকে তারা নিজেদের স্বার্থ অটুট রাখার জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি বজায় রাখছে। এটি সমস্যাকে সামাল দেওয়ার জন্য কূটনৈতিক কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয় এবং আমাদের সেই বাস্তবতাটি বুঝতে হবে। তবে আমাদের হতাশ হওয়া উচিত নয়, বরং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বা অন্য যেকোনো উপায়ে ওই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনই হচ্ছে এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। সে জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে এবং নানা উপায়ে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। তার আগে রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারে রেখে অন্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নেরও চেষ্টা করছে কোনো কোনো শক্তি, এমনটিও মনে করে কূটনৈতিক মহল। আর তা যদি হয়, সেটা হবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –