• মঙ্গলবার   ১৯ অক্টোবর ২০২১ ||

  • কার্তিক ৪ ১৪২৮

  • || ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সর্বশেষ:
পীরগঞ্জের জেলেপল্লীতে আগুন: ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া সেই যুবক গ্রেফতার সারাদেশে আ’লীগের ‘সম্প্রীতি সমাবেশ-শান্তি শোভাযাত্রা’ কর্মসূচি সেবা খাতের আয় দেশে আনার পদ্ধতি আরো সহজ করলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশি ফলন, বন্যাসহনীয় আগাম আমন বীনা-১১ চাষে ঝুঁকছেন কৃষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মনিটর করছে পুলিশ, ‍গুজব ছড়ালেই ব্যবস্থা

১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্টের মিলগুলো

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২১  

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

১৫ই আগস্ট গোটা বিশ্বের ইতিহাসে একটি কৃষ্ণ দিবস, সেদিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস না করা কিছু লোক পাকিস্তান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন-কিসিঞ্জারের ষড়যন্ত্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করেছিলেন। তার ২৯ বছর পর সেই আগস্ট মাসেরই ২১ তারিখে ব্যর্থ হত্যাচেষ্টা চালানো হয় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর। অনেকটা অলৌকিকভাবে সেদিন শেখ হাসিনা বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ অনেকেই, আহত হয়েছিলেন শেখ হাসিনাসহ বহুজন।

২৯ বছরের ব্যবধানে হলেও আগস্ট মাসের এই দুটি ঘটনার মধ্যে প্রচুর মিল রয়েছে। প্রথমত ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের নামনিশানা মুছে ফেলার জন্য, দেশকে আবার পাকিস্তানের অংশে পরিণত করার জন্য। একইভাবে ২১ আগস্টের নারকীয় ঘটনার মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৫ই আগস্ট অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যাকে হত্যা করে বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুরোপুরি নিঃশেষ করে দেওয়া, যা তাঁরা ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করতে পারেননি, কেননা তাঁর যোগ্য কন্যাদ্বয় বেঁচে ছিলেন।

দ্বিতীয় মিলটি হচ্ছে, এই দুটি হত্যাকাণ্ডের হত্যাকারীদ্বয়ের রক্তের মিল। দুটি ঘটনার মূল কুশীলব ছিলেন যথাক্রমে পিতা এবং পুত্র। ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে মূল কুশীলব যে ছিলেন জিয়াউর রহমান, সে ব্যাপারে এত অধিক এবং অখণ্ডনীয় তথ্য-প্রমাণ এসেছে যে এই দাবিকে মোটেও আন্দাজভিত্তিক বলা যায় না, এটি কষ্টিপাথরে প্রমাণিত। তারপর ২৯টি বছর পার হলেও জিয়ার রক্তের ধারক, তাঁর পুত্র তারেক জিয়া ঘটিয়েছিলেন ২১ আগস্টের আক্রমণ বঙ্গবন্ধুকন্যাকে হত্যার উদ্দেশ্যে। তারেক জিয়া যে ২১ আগস্ট আক্রমণের মূল পরিকল্পনাকারী সে কথা সব সাক্ষী-প্রমাণ পর্যালোচনা করে বিচারিক আদালত স্পষ্ট ভাষায়ই রায় দিয়েছেন। সেদিন খুনি তারেক জিয়ার সঙ্গে জড়ো হয়েছিলেন তাঁর মা, ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর, পিন্টু নামের আরেক প্রতিমন্ত্রী, মুফতি হান্নান, সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী ডিজিএফআইপ্রধান জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার, জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার রহিম, পুলিশপ্রধান, পিন্টুর ভাই সংসদ সদস্য মওলানা তাজুদ্দিনসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধু হত্যায়ও ওই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ লোকদের, যথা মোশতাক, জিয়া, শাহ মোয়াজ্জেম, ওবায়দুর রহমান, তাহের ঠাকুর, মাহবুবুল আলম চাষী, খাদ্যসচিব মোমেন খান, জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান সাফদার, সেনা কর্মকর্তা জেনারেল শিশু প্রমুখকে একত্র করতে পেরেছিল পাকিস্তানের আইএসআই এবং মার্কিন সিআইএ। চতুর্থত, দুটি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড ঘটাতে জোরালো ভূমিকায় ছিল পাকিস্তান, সে দেশের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআইয়ের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু হত্যায় যে পাকিস্তান, চীন এবং ওই সময়ের যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রত্যক্ষ হাত ছিল, সে ব্যাপারে কারো মনে সন্দেহ থাকতে পারে না। পরবর্তীকালে মার্কিন গোপন দলিলগুলো উন্মুক্ত হয়ে গেলে এবং সমসাময়িক পাকিস্তানি গণমাধ্যমের প্রকাশনা এবং পাকিস্তান সরকারের কার্যকলাপ, কথাবার্তা থেকেই প্রমাণিত যে বঙ্গবন্ধু হত্যায় পাকিস্তানের এবং মার্কিন ভূমিকা ছিল প্রত্যক্ষ। ওই সময়ের মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট ড. হেনরি কিসিঞ্জার তাঁর লেখা দুটি স্মৃতিকথামূলক পুস্তক, যথা—‘ইয়ারস ইন হোয়াইট হাউস’ এবং ‘ডিপ্লোম্যাসি’তে লিখেছিলেন যে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল কিসিঞ্জারের ব্যক্তিগত পরাজয়, যার কারণে তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধুকে মোটেও সহ্য করতে পারতেন না। কিসিঞ্জার আর যে তিনজনকে তাঁর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তাঁরা ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী, যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছিলেন, সালভাদর আয়ান্দে, যিনি দক্ষিণ আমেরিকায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠারত ছিলেন এবং ঘানার নক্রুমা, কারণ যিনি গোটা আফ্রিকায় জাতীয়তাবোধের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন। কিসিঞ্জারের এই চার শত্রুকেই বিভিন্ন সময়ে হত্যা করা হয়েছে তাঁরই ইঙ্গিতে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায়ও যে পাকিস্তান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল, তার প্রমাণ একাধিক। যেসব গ্রেনেড সেদিন বিস্ফোরিত হয়নি, সেগুলোর গায়ে পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির ছাপ থেকে পরিষ্কার হওয়া গিয়েছিল যে গ্রেনেডগুলো পাকিস্তান থেকেই পাঠানো হয়েছিল। তা ছাড়া এসব উচ্চ বিধ্বংসী ক্ষমতাপূর্ণ আর্জেস গ্রেনেড শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয় বিধায় এগুলো বের করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগে, যা প্রমাণ করছে যে পাকিস্তানের উচ্চ পর্যায়ের সামরিক কর্তারাই ওই গ্রেনেডগুলোকে ছাড়পত্র দিয়েছিলেন।

তা ছাড়া গ্রেনেড ঘটনায় দুজন পাকিস্তানি নাগরিক জড়িত ছিলেন, যাঁদের নাম আবদুল মালেক এবং মাজেদ ভাট, বিচারিক আদালত যাঁদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন।

আমাদের বিজয় ছিল পাকিস্তানের চরম পরাজয়। পাকিস্তানের ৯৭ হাজার সেনা মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। সেই পরাজয়ের গ্লানি পাকিস্তান আজও ভুলতে পারছে না। অদূরভবিষ্যতে ভুলতে পারবে এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না, যার কারণে পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই তাদের গাত্রদাহ শুরু হয়, তাদের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা বেড়ে যায় এবং চেষ্টা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বিএনপি-জামায়াত এবং জঙ্গিদের সহায়তা দিতে, যা অতীতে প্রমাণিত হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে পাকিস্তান খুশি থাকে, ভাবে, তাদের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআইকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করে তাদের আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে পারবে এবং বাংলাদেশকে পাকিস্তানীকরণের দিকে এগিয়ে নিতে পারবে, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যার সূচনা করেছিলেন।

১৫ ও ২১ আগস্টের আরেকটি বড় মিল হলো এই যে উভয় দিবসই গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল, যাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যবহার করা হয়, বঙ্গবন্ধুর রক্তের বাহকদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চিরতরে নস্যাৎ করার জন্য।

১৫ই আগস্টের ষড়যন্ত্র ছিল ওই সময়ের প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে আর ২১ আগস্টের ষড়যন্ত্র ছিল সরকারে প্রতিষ্ঠিতদের দ্বারা, যেখানে প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করা হয়েছে সরকারি নির্দেশে। ১৫ ও ২১ আগস্ট এই উভয় দিবসেই কিছু লোক বিদেশি কয়েকটি দেশের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছে গোপনে।

১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে হত্যা করেছেন, তাঁদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পর্দার অন্তরালে থাকা মূল ষড়যন্ত্রকারী, যথা জিয়া, মোশতাক গং ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ এবং আইন করেছিলেন, আর ২১ আগস্ট ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের রক্ষা করার জন্য প্রথম দিনই প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওই ঘটনার অন্যতম ক্রীড়নক, সংসদ সদস্য মওলানা তাজুদ্দিনকে তড়িঘড়ি করে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেন এবং এ ছাড়া অন্য কুশীলবদের রক্ষা করার জন্য প্রথমে পার্থ সাহা এবং পরে জজ মিঞা নামের জনৈক দিনমজুরকে ভয় এবং লোভ দেখিয়ে আসামি করে এক নাটক সাজিয়ে প্রহসনের বিচারের নাটক মঞ্চায়ন করেছিলেন। আসলে আসামিদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যে প্রশ্ন সবার মুখে মুখে, তা হলো কেন জিয়া পরিবার বঙ্গবন্ধুর রক্তের সব বাহককে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং কিভাবেই বা তাঁরা ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

ঘটনার শুরু ১৯৭১ সালের মার্চ থেকেই। ওই সময় চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন মেজর জিয়া। লোকটি পা থেকে মাথা পর্যন্ত ছিলেন পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন উত্তরাধিকারক্রমে। তাঁর পিতা ১৯৪৭ সালে ভারতের সরকারি চাকরিতে এক নিম্ন পদে ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ ভারত ত্যাগের প্রাক্কালে মুসলমান সরকারি চাকরিজীবীকে সুযোগ দিয়েছিল তারা ভারতে থাকবে, নাকি পূর্ব অথবা পশ্চিম পাকিস্তানে যাবে। জিয়ার পিতা পূর্ব বাংলায় না আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করে পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তাঁকে সেখানেই চাকরিতে পদায়ন করা হয়। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানেই সপরিবারে বসবাস করাকালীন সেখানেই শৈশব থেকে বেড়ে ওঠেন জিয়াউর রহমান, অর্থাৎ সব অর্থেই তাঁর দেশ ছিল পাকিস্তান। পাকিস্তানে বড় হওয়া এবং তাঁর পিতার পাকিস্তানি আনুগত্যের কারণে জিয়া বড় হতে থাকেন পাকিস্তানপ্রেমী হিসেবে, একজন অনুগত পাকিস্তানি হিসেবে। তিনি সেখানে স্কুলে পড়াশোনা করায় একদিকে যেমন উর্দু ভাষা হয়ে যায় তাঁর প্রথম এবং মাতৃভাষা; ঠিক একইভাবে বাংলা ভাষায় তাঁর কোনো জ্ঞানই গড়ে ওঠেনি, যার কারণে তিনি বাংলার চেয়ে উর্দু ভালো বলতে পারতেন, আর বাংলায় তো লিখতেই পারতেন না। পাকিস্তানে স্কুল ও কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে কিছু সময় পরেই তাঁকে পদায়ন করা হয় পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীতে। যদিও পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীতে বাঙালিদের পদায়ন ছিল বিরল, তথাপিও জিয়াকে সেখানেই পদায়ন করা হয়, কারণ জিয়ার পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্যের ব্যাপারে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত ছিল।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে অর্থাৎ ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নাম দিয়ে যেদিন পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করে, সেদিনই জিয়া সোয়াত নামের পাকিস্তানি জাহাজ থেকে পাকিস্তানি সামরিক অস্ত্র নামাতে গিয়েছিলেন, যদিও পথে বাঙালি সেনারা তাঁকে খুন করার ভয় দেখিয়ে বাধা দিলে তিনি আর সে পথে অগ্রসর না হয়ে যাত্রাপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য ছিলেন। এমনকি বর্তমানে চরম জিয়াভক্ত ক্যাপ্টেন (ওই সময়ের) ওলিও জিয়ার গায়ে পিস্তল ঠেকিয়ে ভয় দেখিয়েছিলেন জিয়া পাকিস্তানি সমরাস্ত্র খালাস করতে গেলে তাঁকে হত্যা করা হবে। জিয়া ২৬শে মার্চ অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরেও বহু বাঙালিকে হত্যা করে যুদ্ধাপরাধ করেছেন। সেসব বাঙালিরা পথে ব্যারিকেড দিচ্ছিলেন।

আর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মূল ব্যক্তি তারেক জিয়ার পাকিস্তানপ্রেম উত্তরাধিকার সূত্রে, অর্থাৎ তাঁর পিতামহ থেকে, যে ব্যক্তি ভারত বিভাগের সময় পশ্চিম পাকিস্তানে যেতে মত দিয়েছিলেন। তা ছাড়া তারেক জিয়ার মা খালেদা জিয়াও মনে-প্রাণে প্রচণ্ড পাকিস্তানপ্রেমী, যিনি মুক্তিযুদ্ধকালে এক উঁচু মাপের পাকিস্তানি সৈনিক ব্রিগেডিয়ার জানযোয়ার বিশেষ অতিথি হিসেবে তাঁরই তত্ত্বাবধানে এবং সযত্ন আতিথেয়তায় পুরো ৯টি মাসই কাটিয়েছেন।

২১ আগস্ট হামলার ষড়যন্ত্রে ক্ষমতাসীন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা অংশ নিয়েছিলেন বলে বিচারিক আদালতই বলেছেন। এসব ষড়যন্ত্রকারীর মধ্যে ছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর, যাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল পুলিশ এবং বিডিআর, ছিলেন মুফতি হান্নান, ছিলেন প্রতিমন্ত্রী পিন্টু, ছিলেন প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার হারিছ চৌধুরী, যিনি ছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব, ছিলেন কয়েকজন সংসদ সদস্য, যথা মওলানা তাজুদ্দিন, ছিলেন সামরিক গোয়েন্দাপ্রধান রেজ্জাকুল হায়দার, জাতীয় নিরাপত্তা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার রহিম, তিনজন পুলিশপ্রধান, যথা শহুদুল হক, আশরাফুল হুদা ও খোদা বকস।

এ ব্যাপারে ১৫ই আগস্টের সঙ্গে মিল এভাবে যে সেদিনের ষড়যন্ত্রেও বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ছিলেন, যথা মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেম, তাহের ঠাকুর, ওবায়দুর রহমান, মন্ত্রী মর্যাদার চাষী, সেনা উপপ্রধান জিয়া, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দাপ্রধান সাফদার। ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের কুশীলব মন্ত্রীরা দৃশ্যত আওয়ামী লীগ সদস্য হলেও পরবর্তী সময়ে এটি জানা যায় যে তাঁরা শুরু থেকেই পাকিস্তানপ্রেমী অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াত আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, ঘাপটি মেরে তাঁরা আওয়ামী লীগের মুখোশ পরে অতি কৌশলে আওয়ামী লীগে স্থান করে নিয়েছিলেন, যে কথা মোশতাক, তাহের ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম গংদের বেলায়ও অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁরা সবাই যে পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই এবং মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী সিআইএর চর হিসেবে কাজ করছিলেন, তা-ও পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয়েছে। তাঁরা সত্যিকার অর্থে আওয়ামী লীগার ছিলেন না।

১৫ই আগস্ট যেমন জনরোষ থেকে রক্ষা করার জন্য খুনি জিয়া এবং খুনি মোশতাক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা খুনিদের বাংলাদেশ থেকে বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন, ঠিক তেমনি খালেদা জিয়াও অন্যতম আসামি মওলানা তাজুদ্দিনকে তড়িঘড়ি করে পাকিস্তান পাঠিয়ে দিয়েছিলেন জেনারেল রুমীর পরামর্শ উপেক্ষা করে। এবং পরবর্তী সময়ে হারিছ চৌধুরী এবং কামাল সিদ্দিকিকেও বিদেশে যাওয়ার পথ করে দিয়েছিলেন।

১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে দাবি উত্থাপিত হলেও খুনি জিয়া, মোশতাক তা উপেক্ষা করেছেন। ঠিক একইভাবে জেনারেল রুমী ২১ আগস্ট ঘটনার জন্য তদন্তের দাবি জানালে খালেদা জিয়া তাঁকে পদচ্যুত করেছিলেন। পরে অবশ্য তদন্তের নামে প্রহসন চালানোর জন্য বিচারপতি আবেদিন নামের খালেদা জিয়ার এক অনুগতকে দিয়ে প্রহসনের তদন্ত ঘটিয়েছিল। বিচারপতি আবেদিন এখন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত আসামি।

১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনি জিয়া-মোশতাক গং যেমন ভারতবিরোধী উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড আক্রমণের পরেও পার্থ নামের এক হিন্দু ব্যক্তিকে আসামি সাজিয়ে খালেদা জিয়া সরকার তার পাকিস্তানি প্রভুদের পরামর্শক্রমে এই কথা ছড়াচ্ছিল যে গ্রেনেড হামলা ভারতই করেছে। শুধু তা-ই নয়, খালেদা জিয়া তাঁর প্রতি চরম অনুগত বিচারপতি আবেদিনের মুখ দিয়ে এমন কথা বলিয়েছিলেন যে সেই আক্রমণ ভারতই করিয়েছিল। একজন দক্ষ জাদুকরের মতো সেই বিচারপতি আক্রান্ত এলাকার মাটির ঘ্রাণ গ্রহণ করেই এ কথা বলেছিলেন, সেই বিচারপতি এখন দুদকের মামলায় দুর্নীতির আসামি।

১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই কর্মকর্তারা বাংলাদেশে অবস্থান গ্রহণ করেন, আর ২১ আগস্ট হামলার আগে-পরে বাংলাদেশে তাঁদের অবস্থান এবং কর্মকাণ্ড ছিল দৃশ্যমান।

১৫ই আগস্টের দুই খুনি যথা ডালিম ও রাশেদকে পাকিস্তান শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, তাঁদের পাকিস্তানি পাসপোর্টও দিয়েছে, যে পাসপোর্ট ব্যবহার করে তাঁরা ঘুরে বেড়ান। পাকিস্তান খুনি রশিদের স্ত্রী জোবাইদা রশিদকে শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, তাঁকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ এবং ব্যবস্থা করে দিয়েছে। একইভাবে ২১ আগস্ট গ্রেনেড মামলার অন্যতম সাজাপ্রাপ্ত আসামি মওলানা তাজুদ্দিনকে পাকিস্তানে নিরাপদে আশ্রয় প্রদান করে।

১৫ ও ২১ আগস্টের সবচেয়ে বড় মিল হলো এই যে বিএনপি নেতারা উভয় দিনের ঘটনাই ঘটিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকে চিরতরে শেষ করে দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের স্বেচ্ছাচারী, পাকিস্তানপন্থী শাসনকে স্থায়ী অবস্থান দিয়ে দেশকে আস্তে আস্তে পাকিস্তানে পরিণত করা।

১৫ ও ২১ আগস্ট উভয় দিনের নারকীয় কাণ্ড ঘটানোর আগে বেশ কয়েক দফা বৈঠক করেছিলেন খুনি ও কুশীলবরা। এ ধরনের সভা হয়েছিল খুনি মোশতাকের ঢাকার বাড়ি আগামসিহ লেনে, হয়েছিল কুমিল্লার বার্ডের (বাংলাদেশ রুরাল ডেভেলপমেন্ট) দপ্তরে, হয়েছিল দাউদকান্দির এক মাদরাসায়, ফারুক-রশিদের সঙ্গে হয়েছিল জিয়ার বাড়িতে, বালুরঘাট সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকায়। একইভাবে ২১ আগস্টের আগেও বেশ কয়েক দফা ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক হয়েছিল তারেক জিয়ার হাওয়া ভবনে, আবদুস সালাম পিন্টুর বাড়ি, লুত্ফুজ্জামান বাবরের বাড়ি, যে কথা বিচারিক আদালতের রায়ে প্রকাশিত হয়েছে।

এ কথা বলাই বাহুল্য যে স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানপ্রেমিকরা এখনো তাঁদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন বিরামহীন গতিতে। তাঁদের থামানো আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।

১৫ই আগস্টের আগে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা ঘাপটি মেরে থাকা মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। একইভাবে ২১ আগস্টের আগে বিএনপি-জামায়াত সরকার মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের ডিজিএফআই, এনএসআই এবং পুলিশপ্রধান পদে পদায়ন করেছিল।

লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –