• রোববার ১৬ জুন ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ২ ১৪৩১

  • || ০৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

পৃষ্ঠপোষকতায় প্রসার ঘটবে মৃৎশিল্পের

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২৩  

 
এক সময় মাটির জিনিস তৈরিতে চৈত্রমাস জুড়ে মৃৎশিল্পীরা ব্যস্ত সময় পার করতেন। কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে যাওয়া এ শিল্পটি বৈশাখ এলেই ফিরে আসে মৃৎশিল্পীদের হাতে। বৈশাখকে সামনে রেখে বিভিন্ন হাট বাজারের কোনায় কোনায় বসে বিক্রি করে তাদের হাতের তৈরি এসব জিনিসপত্র। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখনো মাটির পণ্যের চাহিদা ফুরিয়ে যায়নি। যদিও আগের মতো এখন আর মাটির তৈরি জিনিসপত্রের ব্যবসা বা চাহিদা নেই।

মার্কেটে মেটালের জিনিসপত্র আসার পর থেকে মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা কমে গেছে। আর মাটির তৈরি জিনিসপত্র আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের আরো প্রসার ঘটবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

অতীতকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে বৈশাখে বাঙালিদের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই নববর্ষের পহেলা বৈশাখে। হাতের তৈরি মাটির তৈরি থালা-বাসন, বিভিন্ন খেলনা তৈরির কাজ শেষ করে বৈশাখী মেলার জন্য প্রস্তুত মৃৎশিল্পীরাও। লক্ষ্য এবার বৈশাখী মেলা সামনে রেখে বেচা-বিক্রি বাড়াতে হবে। অপরদিকে বৈশাখকে সামনে রেখে গ্রামগঞ্জের টিনের চালাসহ বিভিন্ন দোকানগুলো সাজানো হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রঙে। আবার হরেকরকম রং দিয়ে লেখা আছে শুভ হালখাতা।

সীমান্তবর্তী এ জেলায় কর্মহীন অনেক মানুষই এখন দারিদ্রতার শিকার। তিস্তা, ধরলা ও রত্নাই নদীর আগ্রাসিতায় ছিন্নভিন্ন এ জনপদ। কর্মসংস্থানের জন্য ছুটে বেড়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এমন সব পরিস্থিতি মোকাবিলায় দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের সারা জাগানো উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটের মৃৎশিল্প। তবে শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে কাজ করছেন জেলার কয়েকটি মৃৎশিল্প মাত্র কয়েকটি পরিবার।

পাঁচটি উপজেলা নিয়ে গঠিত উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাট। জেলায় ৮০-৯০ দশকেও এ শিল্পটি ছিলো জমজমাট। কালের বিবর্তনে এখন জেলায় মাত্র ১৫ থেকে ১৬টি পরিবার এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। শত কষ্টের মধ্যেও সদর উপজেলার হাড়াটি ইউপির কুমারপাড়া এ শিল্পটিকে এখনো আঁকড়ে ধরে আছে সেখানকার গুটি কয়েক পরিবার।

হাড়াটি ইউপির কুমারপাড়ার ধীরেন চন্দ্র পাল বলেন, দাদার আমল থেকে মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে আসছি। দাদা মারা গেলে বাবা দায়িত্ব নেন। বাবা পরপারে চলে গেলে এখন আমিই এ শিল্পটা ধরে রেখেছি। জীবন বাঁচার তাগিতে অনেকে এ শিল্প ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। বর্তমানে একমাত্র আমরাই এ শিল্পকে ধরে রেখেছি।

এ শিল্পের কাজ করে কি সংসার চলে এমন প্রশ্নে তিনি আরো বলেন, শুধু বৈশাখ আসলেই এ কাজে হাত দেই। তাছাড়া ১২ মাসে তো অন্য কাজ করে সংসার চালাতে হয়। বাইরে যখন কাজ থাকে না, ঐ সময় আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজন দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কাজ করি, অনেকে রিকশাও চালান। এরপর আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হয় কখন বৈশাখ আসবে।

কিমার বেরেন চন্দ্র পাল বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা কোনো প্রণোদনা পাইনি। একদিন কাজ না করলে আমাদের পেটে ভাত যায় না। আমাদের কি এত ঘোরার সময় আছে কাগজের জন্য। ট্রেনিং করাবে বলে তিন বছর আগে কাগজ দিয়েছি, এখনো ট্রেনিং করতে পাই নি।’

কুমারপাড়ায় কাদা মাটিকে পুঁজি করে নিজেদের আদি শিল্পকে ধরে রেখেছেন কুমাররা। ক্ষুদ্রভাবে তৈরি হচ্ছে, হাড়ি, পাতিল, ঘটি, কলসি, মাটির প্লেট, বাটি, বাটনাসহ বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজের শিল্প। নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পের অবয়ব। বৈশাখে বাড়তি উপার্জনের আশায় দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন শিল্পীরা।

রাপিন চন্দ্রপাল বলেন, হাত দিয়ে সব শিল্পের কারুকার্য তৈরি করি।  মাটির তৈরি করার মেশিন ও হাড়ি পাতিল তৈরি করতে মটরসেট পেলে, এ কাজটি আরো ভালোভাবে করতে পারতাম। এখন আমাদের সাধ্য নেই এগুলো কেনার।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আইয়ুব আলী বলেন, ‘কুমাররা এক সময় এ পেশাকে উপলক্ষ করে তাদের জীবন চলতো। তখন কুমারপাড়ার জমজমাট অবস্থা ছিলো। কারিগররা আসতো কাজ করতো, ভ্যান দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় (গ্রামগঞ্জে) এগুলো বিক্রি করতো। এখন আর মানুষের মাটির তৈরি এসব জিনিসপত্রের চাহিদা নেই।’  

লালমনিহাট জেলা বিসিক কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক এহেসানুল হক বলেন, মাটির তৈরি এ শিল্পটিতে যে ইনভেস্ট করা হয় এটি সামান্য। আমরা এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারি। কিন্তু সেটিও যথেষ্ট না। আমরা যে তাদের আর্থিক সাহায্য করবো এজন্য আমাদের ল্যান্ড, জামানতসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে নিয়মগুলো রয়েছে সেগুলো তারা অর্জন করতে পারে না।

সিলভার মার্কেটে আসার পর থেকে মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা কমে গেছে। সেটি আস্তে আস্তে এখনো হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের আরো প্রসার ঘটবে বলে মনে করে বিশেষজ্ঞরা।

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –