• রোববার ১৪ এপ্রিল ২০২৪ ||

  • বৈশাখ ১ ১৪৩০

  • || ০৪ শাওয়াল ১৪৪৫

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় ভাষা শহিদদের স্মরণ

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  

বাংলাকে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষার মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবির মধ্য দিয়ে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় ভাষা শহিদদের স্মরণ করেছে সমগ্র জাতি। ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে ফুল হাতে স্মৃতির মিনারে জড়ো হয় আপামর জনতা।

সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পাশাপাশি নানা শ্রেণিপেশার মানুষের শ্রদ্ধার ফুলে ভরে উঠেছে শহিদ বেদী। বুধবার শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে এসে কাঙ্খিত লক্ষ্যে দেশকে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয় জানান অনেকে।

২১ ফেব্রুয়ারি ‘শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালন উপলক্ষে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একুশের প্রথম প্রহরেই হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে বাঙালির শোক আর অহংকারের এই মিনার।

রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় অমর একুশের কালজয়ী গান-‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ বাজানো হয়।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষা আন্দোলনের বীর শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এরপর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শহিদ মিনারে পুনরায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু। পরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

এদিকে মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হিসেবে এ পর্যন্ত ২১ বার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদিতে তার ২১ বারের ২১টি পুষ্পস্তবক অর্পণের দুর্লভ ছবি নিয়ে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রথমবারের মত একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। শেখ হাসিনা একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে এই প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শহিদ মিনারে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান। পরে তিন বাহিনী প্রধান, আইজিপি, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান, র‌্যাব, বিজিবি, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনসহ শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টি, জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রথম প্রহরে ফুল দিয়ে স্মরণ করা হয় ভাষা শহিদদের।

এর আগে বুধবার মধ্য রাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার আগেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের অগণিত মানুষ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এলাকায় উপস্থিত হন। এ সময় হাজার হাজার মানুষ খালি পায়ে বুকে শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ ধারণ করে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’- গানে কণ্ঠ মিলিয়ে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের দিকে এগিয়ে যান। একই সঙ্গে তারা সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের এবং অন্যান্য জাতিসত্ত্বার ভাষা ও বর্ণমালা সংরক্ষণের দাবি জানান।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও সিনেট সদস্য, সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম, গণফোরাম, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, বাংলা একাডেমি, জাতীয় প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, শিল্পকলা একাডেমি, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ভাষা শহীদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে সকালে দলের পক্ষ থেকে প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহিদদের কবরে ও কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন ও সুজিত রায় নন্দী, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সংস্কৃতি সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক ওয়াসিকা আয়েশা খান, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক ফরিদুন্নাহার লাইলী, শিক্ষা ও মানবসম্পদ সম্পাদক শামসুন্নাহার চাপা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক আবদুস সবুর, উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সৈয়দ আব্দুল আউয়াল শামীম, উপ-দফতর সায়েম খান প্রমুখ।

এছাড়া আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে অনেক বিদেশি নাগরিককে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদিতে ফুল দিয়ে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গেছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বুধবার ছিল সরকারি ছুটির দিন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে রাজধানীসহ সারাদেশের স্কুল-কলেজ ও পাড়া-মহল্লায় ছিল নানা আয়োজন। অস্থায়ী শহিদ মিনার তৈরি করে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সবাই। এই শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় বেঁচে থাকবে আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা এমনটাই প্রত্যাশা সবার। এসব আয়োজনে শিশুদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

‘শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রভাতফেরি সহকারে শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে মানুষ, জারি হয় ১৪৪ ধারা, ভেঙে ফেলা হয় শোষকের শৃঙ্খল। রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। গুলিতে বিদীর্ণ হয় বুক। শহিদ হন রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেকে। ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে ইতিহাস গড়েন তারা। বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একাত্তরে জন্ম নেয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গের এই দিনকে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেয় ১৯৯৯ সালে। অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। একুশের চেতনার প্রতীক ‘শহিদ মিনার’ এখন এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ সব মহাদেশের বহুভাষিক চেতনার স্মারক।

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –