• সোমবার ১৫ এপ্রিল ২০২৪ ||

  • বৈশাখ ১ ১৪৩০

  • || ০৫ শাওয়াল ১৪৪৫

বাংলাদেশের জন্মের ঘোষণা

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০২৩  

মো. জাকির হোসেন

আজ ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিন বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে এই দিনটিকে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস হিসেবেও ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে এ দেশের জনগণের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চেই বিশ্বের অন্তত ২৫টি দেশের পত্রিকা বা সংবাদ সংস্থার খবরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও তাঁকে আটকের সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মধ্যে অন্যতম হলো—বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, দিল্লির দ্য স্টেটসম্যান, ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, নিউ ইয়র্ক টাইমস, আয়ারল্যান্ডের দ্য আইরিশ টাইমস, আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস হেরাল্ড, ব্যাংকক পোস্ট, বার্তা সংস্থা এপি। এ ছাড়া ভারত, ব্রাজিল, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, হংকং, নরওয়ে, তুরস্ক, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশের বহু সংবাদপত্রের খবরে স্থান পায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর। উদাহরণস্বরূপ ওই সময়ের দু-একটি সংবাদ শিরোনাম উল্লেখ করছি—নিউ ইয়র্ক টাইমসে বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার ছবি ছাপিয়ে পাশেই লেখা হয়, ‘স্বাধীনতা ঘোষণার পরই শেখ মুজিব আটক’; ব্যাংকক পোস্টের খবরে বলা হয়, ‘শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ নাম দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে’; ভয়েস অব আমেরিকার খবরে বলা হয়, ‘...ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনী আক্রমণ শুরু করেছে। মুজিবুর রহমান একটি বার্তা পাঠিয়েছেন এবং সারা বিশ্বের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।’ নিউ ইয়র্ক টাইমস ১৮ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে প্রকাশিত নিবন্ধে লিখেছে, ‘২৫ মার্চ রাত ১০টা ৩০ মিনিটে শেখ মুজিব চট্টগ্রামে রেকর্ড করা বার্তা পাঠিয়েছিলেন, যে বার্তার মূল বক্তব্য ছিল, আমার যা-ই হোক না কেন, পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলো। এখন থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’

স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টি ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রতিষ্ঠার আইনগত দলিল হলো একাত্তরের ১০ এপ্রিল প্রণীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বা যুদ্ধকালীন সরকার পরিচালনার অন্তর্বর্তী সংবিধান। এরই ভিত্তিতে পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ ও গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পরও এই ঘোষণাপত্র সংবিধান হিসেবে কার্যকর ছিল। ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারির পর এর কার্যকারিতার সমাপ্তি ঘটে। এই ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান ও সেই ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদনের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। ঘোষণায় উল্লেখ রয়েছে, ‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান।’ ঘোষণায় আরো বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি এবং এর দ্বারা পূর্বাহ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি; এবং এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।’ সাবেক বিএনপি নেতা বর্তমান এলডিপিপ্রধান কর্নেল অলি (অব.) ‘Revolution, Military Personnel and The War of Liberation in Bangladesh’ গ্রন্থে তাঁর চাকরিকালীন বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন সংযোজন করেছেন। গোপনীয় প্রতিবেদনটি লিখেছেন প্রয়াত বিএনপি নেতা মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী। তৎকালীন ব্রিগেড কমান্ডার মীর শওকত আলী অলি আহমদ সম্পর্কে লিখেছেন—‘He in fact was the first officer who took risk and on his own initiatives informed Gen. Ziaur Rahman regarding declaration of Independence on night 25/26 March 71।’ যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘বস্তুত তিনিই প্রথম কর্মকর্তা, যিনি ঝুঁকি নিয়ে নিজ উদ্যোগে একাত্তরের ২৫-২৬ মার্চ রাতে স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অবহিত করেন।’ মীর শওকতের এই প্রতিবেদনটি পরবর্তী সিনিয়র অফিসার হিসেবে জিয়াউর রহমান নিজেই সত্যায়িত করেছেন।

২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হলেও মূলত ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। ৭ মার্চের পর পাকিস্তানি শাসন অকার্যকর হয়ে যায়, সব কিছু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হতে শুরু করে। দেশের নানা প্রান্তে স্বাধীনতার খণ্ড যুদ্ধও শুরু হয়ে গিয়েছিল। সিদ্দিক সালিক তাঁর ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মুজিব প্রদেশে সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠা করে ডি ফ্যাক্টো শাসকে পরিণত হন।’ ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সারা বিশ্বের হালনাগাদ ঘটনাবলির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি প্রতিবেদন দেয়, যার শিরোনাম ছিল ‘Mujibur Rahman has announced his takeover of the administration of the East Pakistan’, অর্থাৎ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা যথার্থই বলেছেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ আসলে স্বাধীনতার মূল দলিল।’ টাইম ম্যাগাজিনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ‘শেখ মুজিব ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমেই আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।’ এএফপি তার বিশ্লেষণে বলেছে, ‘৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বাঙালিদের যুদ্ধের নির্দেশনাও দিয়ে যান। ওই দিনই আসলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।’ ওয়াশিংটন পোস্টের এক ভাষ্যে বলা হয়, ‘শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণই হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার মৌলিক ঘোষণা। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতাযুদ্ধ হয়েছে ওই ভাষণেরই আলোকে।’ ৭ মার্চের ভাষণই যে স্বাধীনতার ঘোষণা তা বঙ্গবন্ধুর বয়ানেও স্পষ্ট হয়ে যায়। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে এ বিষয়ে লিখেছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বাড়িতে ফিরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার যা বলার ছিল আজকের জনসভায় তা প্রকাশ্যে বলে ফেলেছি। সরকার এখন আমাকে যেকোনো মুহূর্তে গ্রেপ্তার বা হত্যা করতে পারে। সে জন্য আজ থেকে তোমরা প্রতিদিন দুবেলা আমার সঙ্গে একত্রে খাবে।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘সেদিন থেকে এ নিয়ম (বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে খাওয়া) আমরা ২৫ মার্চ দুপুর পর্যন্ত পালন করেছি।’

যারা বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, মুক্তিযুদ্ধের প্রাণভোমরা বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে অস্বীকার করে, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টির আইনগত দলিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে যারা অস্বীকার করে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, না বিপক্ষে—সেই সিদ্ধান্ত এ দেশের জনগণকেই নিতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের জীবদ্দশায়ই যদি স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্ক, স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি, রাষ্ট্রের স্থপতিকে অস্বীকার আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়; যখন একজন মুক্তিযোদ্ধাও বেঁচে থাকবেন না, তখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের সংগ্রাম কতটা কঠিন হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –