• মঙ্গলবার   ২২ জুন ২০২১ ||

  • আষাঢ় ৭ ১৪২৮

  • || ১০ জ্বিলকদ ১৪৪২

সর্বশেষ:
সর্বোচ্চ পেশাদারী দক্ষতা ও উৎকর্ষতা অর্জনে মনোযোগ দিন- প্রধানমন্ত্রী ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ চলছে সেতাবগঞ্জ পৌরসভায় টাইগার মাল্টিপল লঞ্চ মিসাইল সিস্টেম যোগ হলো সেনাবাহিনীতে `রেটুন শস্য` আবাদে আলোড়ন তুলেছেন ভূরুঙ্গামারীর কৃষকরা দিনাজপুর সদরে আরো ৭ দিন বাড়ল লকডাউন

রংপুরের লাহিড়ীরহাটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ৮ মে ২০২১  

গতকাল ৭ মে শুক্রবার লাহিড়ীরহাট গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রংপুরে এই দিনে ঘটেছিল এক অকল্পনীয় হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লাহিড়ীরহাটে এক পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল। সেদিন লাশের নেশায় মেতে ওঠা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তাণ্ডবে নিরস্ত্র ৩২ জন মানুষের রক্তে শুকনা মাটি ভিজে লাল হয়েছিল।

রংপুর নগরীর প্রাণকেন্দ্র থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে লাহিড়ীরহাট। হানাদার বাহিনী ওই এলাকায় জুমার নামাজের পর নিরীহ মানুষজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যাকাণ্ড চালায়। স্বাধীনতার পর থেকে রংপুরের মানুষ বেদনাবিধুর সেই দিনটিকে ‘লাহিড়ীরহাট গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।

একাত্তরের ৭ মে শুক্রবার, দিনটি ছিল ১২ রবিউল আউয়াল, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী। এমন একটি দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কোনো আক্রমণ করবে না, এমন সরল বিশ্বাসে জুমার নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাওয়া অনেক মানুষ নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। এদিকে বাড়িফেরা মানুষের প্রাণনাশের পরিকল্পনা করতে থাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা।


পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা দেওডোবা ও বড়বাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে দামোদরপুর পর্যন্ত ঘরে ঘরে তল্লাশি করে গ্রাবাসীদের বন্দি করতে শুরু করে। সে সময় বড়বাড়ি গ্রামের আন্দারু মিয়াজির মসজিদে জুমার নামাজ শেষে মিলাদ মাহফিল চলছিল। অতর্কিতভাবে সেখানে ৪টি ট্রাক নিয়ে উপস্থিত হয় পাকিস্তানি সৈন্যরা। তারা ট্রাক থেকে নেমে মসজিদ ঘেরাও করে ফেলে। কয়েকজন সৈন্য মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে মিলাদ পড়ার জন্য অবস্থানরত ৩২ জন মুসল্লিকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ধরে নিয়ে যায়।

মসজিদের বাকি মুসল্লিরা অনেক কাকুতি-মিনতি করেন। সেদিন ভয়ার্ত মানুষদের চিৎকারে মসজিদের আশপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু তাদের কান্না বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের কানে পৌঁছেনি।

পরে ৩২ জন মুসল্লিকে লাহিড়ীরহাটের একটি পুকুরপাড়ে আনা হয়। তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বাবা চান ছেলের প্রাণভিক্ষা, আর ছেলে চান বাবার প্রাণভিক্ষা। কিন্তু দস্যুদের মন একটুও নরম হয়নি।

মুহূর্তেই গর্জে উঠল হানাদারদের অস্ত্র। গুলি করে হত্যা করা হলো বাবা-ছেলে সবাইকে। এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকা জনমানবশূন্য হয়ে যায়। প্রাণভয়ে পালিয়ে যায় এলাকাবাসী। গুলিবিদ্ধ কয়েকজন মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা তখন আহতদের মাথায় বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। মসজিদ থেকে জোর করে ধরে আনা কোনো মুসল্লিকেই বাঁচতে দেয়নি ঘাতকরা।

সবার মরদেহ পড়ে থাকে লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমিতে। সেদিন মরদেহ দাফন করার মতো এলাকায় কোনো মানুষ ছিল না। মুসল্লিদের মরদেহের পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করেনি কেউ। মরদেহের গোসল করানো ও কাফনের কাপড় পরানো হয়নি।

পাকিস্তানি সৈন্যরা পরবর্তী সাত মাস প্রায় একইভাবে বিভিন্ন গ্রাম থেকে কয়েক হাজার গ্রামবাসীকে ধরে এনে রাতের বেলা লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমিতে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছিল। তাদের পরিচয় আজও জানা যায়নি। স্বাধীনতার পর ওই স্থানের বিভিন্ন গর্ত থেকে অসংখ্য মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার করে সসম্মানে গণকবরে সমাহিত করা হয়েছে।

এদিকে এত বছর পরও ৭ মের সেই বর্বরতায় শহীদদের সবার পরিচয় সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পরে তেমন কোনো উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়নি। তাই আজ ৫০ বছর পরেও জানা সম্ভব হয়নি সেসব শহীদের পরিচয়। রংপুরের মুক্তিযোদ্ধারা তৃণমূল পর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে ২৯ জনের পরিচয় পেয়েছেন।
তারা হলেন রাধাবল্লভ এলাকার আবেদ আলী সরকারের ছেলে মনোয়ার হোসেন বেনু, সাতগাড়া মিস্ত্রিপাড়ার শমসের আলী পেয়াদার ছেলে নওয়াব আলী বাপাত, পীরজাবাদ এলাকার আব্দুল মজিদের ছেলে আব্দুল করিম, দামোদরপুরের শমসের আলী পানাতির ছেলে আজগর আলী, একই গ্রামের আমীর উল্লাহ শাহের ছেলে শাহ্ সেকেন্দার আলী, সেকেন্দার আলীর ছেলে মিন্টু মিয়া, নয়া মিয়া প্রেসিডেন্টের ছেলে শাহ্ মো. নূরল আনাম।

খোদা বকস্ মৌলভীর ছেলে মো. আজহার আলী, দেওডোবা বড়বাড়ি এলাকার মো. আমিনের ছেলে মো. আজগর আলী, মহির উদ্দিনের ছেলে মো. মনসুর আলী, খট্টু শেখের ছেলে মো. আব্দুল জব্বার মিয়া, ন্যাকাড়টারি বড়বাড়ি গ্রামের নছির উদ্দিনের ছেলে আব্দুস সাত্তার, বাতাসু মিয়ার ছেলে মো. মোফাজ্জল হোসেন, আব্দুল মুকিতের ছেলে মো. নবানু মিয়া, মো. কান্দুরা মিয়ার ছেলে মো. আব্দুল আজিজ, খোকা মামুদের ছেলে মো. এসরাত উল্লাহ, মো. আব্দুল গফুরের ছেলে মো. নূরুল ইসলাম।

করিম উদ্দিন মুন্সীর ছেলে মো. আব্দুস সোবহান, মো. আলিম উদ্দিনের ছেলে মো. ইয়াসিন আলী, মো. আলিম উদ্দিনের ছেলে মো. সোলায়মান মিয়া, হাছেন আলীর ছেলে মো. আব্দুর রাজ্জাক, মিয়াজন মিয়ার ছেলে মো. মনসুর আলী, শহর উদ্দিনের ছেলে মো. লুৎফর রহমান, আব্দুল জব্বারের ছেলে আব্দুর রহিম। অন্য শহীদদের পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে নির্মম গণহত্যার সাক্ষী লাহিড়ীরহাটের বধ্যভূমি অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে আছে। সেখানে স্থানীয়দের উদ্যোগে নির্মিত একটি স্মৃতিফলক ছাড়া আর কিছুই নেই। অথচ এই বধ্যভূমিতে শহীদ শত শত বাঙালির আত্মার হাহাকার, আর্তনাদ ও কান্নার আওয়াজ আজও গুমরে ওঠে।

লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমি
লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমি রংপুরের প্রধান বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম। রংপুর শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার কিলোমিটার পশ্চিমে রংপুর-বদরগঞ্জ সড়কের পাশে লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমির অবস্থান। সামান্য একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে লাহিড়ীরহাট-শ্যামপুর রোডের পাশে একটি অংশে। এ ছাড়া কোনো কিছুর চিহ্ন নেই সেখানে।

ওই দিনের ঘটনার সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী খালেকুজ্জামান জানান, একাত্তরের ৭ মে লাহিড়ীরহাটে ৩২ জন যুবক ও মধ্য বয়সী মানুষকে ধরে এনে পাক হানাদার বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে। সেদিন মৃতদেহগুলো স্বচক্ষে দেখেছেন। শহীদদের বেশির ভাগই ছিলেন সাতগাড়া, দেওডোবা, বড়বাড়ি ও ন্যাকাড়টারি গ্রামের বাসিন্দা।

তিনি ওই বধ্যভূমিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সংরক্ষণ ও স্মৃতিফলক স্থাপনের দাবি জানিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের মানুষের ওপর যে গণহত্যা হয়েছে, তার স্মারক লাহিড়ীরহাট বধ্যভূমি। এটি সংরক্ষণ করা গেলে নতুন প্রজন্ম সেই ইতিহাস জানতে পারবে, শহীদদের মনে রাখবে, শ্রদ্ধা জানাতে পারবে।

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –