ব্রেকিং:
দিনাজপুরে কালবৈশাখীর তাণ্ডব, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা। কাহারোল থানার ১ নং ডাবোর ইউনিয়নে বজ্রপাতে একজন নিহত, আহত ২
  • রোববার   ০৯ মে ২০২১ ||

  • বৈশাখ ২৬ ১৪২৮

  • || ২৬ রমজান ১৪৪২

সর্বশেষ:
লাইলাতুল কদর এক মহিমান্বিত রজনী- প্রধানমন্ত্রী পবিত্র রজনীতে করোনা থেকে রক্ষার প্রার্থনা করি- রাষ্ট্রপতি বিরামপুরে `জয়বাংলা ভিলেজ’ পরিদর্শনে এমপি শিবলী সাদিক রংপুরে হঠাৎ বেড়েছে ছাগল চুরি মরিচের ফলন ভালো, দামে শঙ্কায় কৃষক

রংপুরের গ্রামেগঞ্জে দিন দিন বাড়ছে নেপিয়ার ঘাসের চাষাবাদ

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –

প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২১  

রংপুরে দিন দিন বাড়ছে নেপিয়ার ঘাসের চাষাবাদ। গ্রামেগঞ্জে খড়ের বিকল্প গরু-ছাগলসহ অন্যান্য গবাদিপশুকে খাদ্য হিসেবে দেওয়া হচ্ছে নেপিয়ার ঘাস। ফলে উন্নত জাতের এই ঘাস গবাদিপশুর খাদ্যচাহিদা মেটাচ্ছে। খড়ের দামের তুলনায় নেপিয়ার ঘাস সাশ্রয়ী হওয়ায় পশু পালনকারীরাও ঝুঁকছেন এ ঘাস চাষে। আবার অনেকেই ঘাস চাষ করে হচ্ছেন আত্মনির্ভরশীল।

জেলার বদরগঞ্জ ও পীরগাছা উপজেলায় ব্যাপক হারে বিদেশি নেপিয়ার ঘাসের চাষাবাদ হচ্ছে। কৃষি ও পতিত জমি এবং বাড়ির আশপাশে নেপিয়ার ঘাসের ছড়াছড়ি। বিচালি ও খড়ের চেয়ে এখন এই ঘাসের চাহিদা অনেক বেশি। এ কারণে কৃষক ও খামারিরা নেপিয়ার ঘাস চাষে উদ্যোগী হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে খড়ের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বিদেশি জাতের নেপিয়ার ঘাস।

সরেজিমনে বদরগঞ্জের গোপালপুর ইউনিয়ন গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ কৃষক ও খামারি নেপিয়ার ঘাস চাষ করছেন। তাদের কেউ গবাদিপশুর খাদ্যচাহিদা পূরণে ঘাস রোপণ করছেন। আবার কেউ কেউ বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হতে নেপিয়ার ঘাস চাষে উদ্যোগী হয়ে উঠেছেন।

ঘাসচাষি আকন্দপাড়ার কৃষক আজিজার রহমান বলেন, আমাদের গরু বেশি। খড়ের দাম বেশি হওয়ায় এখন এই ঘাস খাওয়ানো হচ্ছে। নেপিয়ার ঘাস চাষে অল্প খরচে বেশি লাভ হয়। ২৫ শতক জমিতে এই ঘাস শুরু রোপণ করতে দুই হাজার টাকার মতো খরচ হয়। বর্তমান বাজারে ওই জমি থেকে সাত থেকে আট হাজার টাকার ঘাস বিক্রি করা যাবে। এতে খরচ বাদ দিলে পাঁচ হাজার টাকার বেশি লাভ হবে। এ কারণে কৃষকেরা কম বেশি সবাই এখন এই ঘাস চাষ করছে।

একই গ্রামের রওশন আরা বলেন, ছয় বছর ধরে নেপিয়ার ঘাসের চাষ করছি। এতে লাভ বেশি। খরচ খুবই কম। গাভির দুধও বেশি হয়। এই ঘাস চাষের জন্য বীজ বোনা ও চারা লাগানো যায়। বীজ বুনলে দেড় মাস এবং চারা লাগালে এক মাসের মধ্যে ঘাস বড় হয়ে যায়। প্রতি মাসে অল্প ফসফেট, পটাশ ও ইউরিয়া সার দিতে হয়। মাঝেমধ্যে একটু সেচও দিতে হয়।

নেপিয়ার ঘাসের চাষাবাদে তেমন পরিশ্রম করতে হয় না। খুব বেশি ব্যয় না হওয়ায় কৃষকেরা অল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে লাভবান হচ্ছেন। এ জাতের ঘাস রোপণের এক থেকে দুই মাসের মাথায় কাটার উপযোগী হয়ে যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে একই গোছা (গোড়া) থেকে চারা গজায়। সে ক্ষেত্রে দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে কাটার উপযোগী হয় ঘাস। একটি গোছা থেকে ১২ থেকে ১৫ কেজি ঘাস হয়। একটি গরুর জন্য প্রতিদিন ৭ থেকে ১০ কেজি ঘাস প্রয়োজন হয়। একবার বীজ বুনলে বা চারা রোপণ করলে কয়েক বছর অনবরত ঘাস পাওয়া যায়। ফলে খরচ কম হয়।

এই ঘাস চাষ করে গরু-ছাগলকে খাওয়ানোর পাশাপাশি জমি থেকে ঘাস বিক্রিও হচ্ছে। ঘাসের টাকায় সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। এখন ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ, জমির সার-কীটনাশক কেনার জন্য আগের মতো কষ্ট করতে হয় না। গ্রামের অনেকেই ঘাস চাষ করে লাভবান হয়েছে। এই ঘাস চাষে বেকারত্বও ঘুচেছে, বলেন রওশন আরা।
ওই ইউনিয়নের নান্দিনার দিঘীরপাড় এলাকায় জমি থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ঘাস কেটে নিয়ে ভ্যানে করে বাড়ি ফিরছিলেন কৃষক ওমর আলী। তিনি  বলেন, এখানে নেপিয়ার ঘাসের আবাদ খুবই ভালো হয়। ঘাসের দামও প্রচুর। মৌসুমে এক দোন জমি (২৫ শতক) থেকে উৎপাদিত ঘাস ৮ হাজার টাকা বিক্রি হয়। আগে এই ইউনিয়নে ধান ও কলার চাষাবাদ বেশি হতো। এখন লাভ বেশি হওয়ার নেপিয়ার ঘাসের চাষ বেড়েছে।

পীরগাছার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের প্রতিপাল বগুড়াপাড়া গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন জানান, শুধু কাণ্ড রোপণ করে নেপিয়ার ঘাসের চাষাবাদ করা হয়। কোনো ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা লাগে না। শুধু গোবর সার ব্যবহার করে দ্রুতবর্ধনশীল এ ঘাসের চাষাবাদ করা যাচ্ছে। এ জাতের ঘাস রোপণের এক থেকে দুই মাসের মাথায় কাটার উপযোগী হয়ে যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে একই গোছা (গোড়া) থেকে চারা গজায়। সে ক্ষেত্রে দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে আবার কাটার উপযোগী হয়।

তিনি আরও জানান, নেপিয়ার ঘাস গরুর স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। এই ঘাসে পুষ্টি বেশি। কোনো ক্ষতিকর প্রভাব না থাকায় এ ঘাস গবাদিপশুর জন্য খুবই উপযোগী। গরু কাঁচা ঘাস পায়। অন্যান্য দানাদার খাবার গরুকে বেশি খাওয়ালে তাতে সব খাদ্যগুণ পাওয়া যায় না। এ ছাড়া খাদ্য হিসেবে শুধু ঘাস দিলে গরুর পরিপাকব্যবস্থা ভালো থাকে।

একই গ্রামের প্রবাসী আল-আমিনের স্ত্রী কোহিনূর বেগম গরু পালন করেন। তার গোয়ালে সব সময় ৪ থেকে ৬টি গরু থাকে। তিনি গরু মোটাতাজাকরণ করেন। বাড়ির পাশে পতিত জমিতে নেপিয়ার ঘাসের চাষ করেছেন। গরুর খাদ্যের চাহিদা পূরণে খড়ের বিকল্প হিসেবে তিনি নেপিয়ার ঘাস চাষে ঝুঁকেছেন। এখন এ ঘাস চাষ করে তার গোখাদ্যের সংকট দূর হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর জেলায় নেপিয়ার ঘাসের চাহিদা অনেক বেশি। নেপিয়ার ঘাস একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। একবার লাগালে কয়েক বছর ধরে ঘাস পাওয়া যায়। অন্য ফসলের মতো নেপিয়ার ঘাসের পরিচর্যা করা লাগে না। সময়মতো সেচ আর সামান্য সার দিলেই ভালো ফলন হয়। অনেক কৃষক ও খামারি এখন নেপিয়ার ঘাস চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। নেপিয়ার জাতের ঘাস গরুর খাবারের ছয়টি উপাদানের সুষম চাহিদা পূরণ করে।

এ ব্যাপারে রংপুর জেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সিরাজুল হক বলেন, কমবেশি সব জায়গায় এখন নেপিয়ার ঘাসের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে বেশি চাষাবাদ হয় বদরগঞ্জ, পীরগাছা ও সদর উপজেলায়। বর্তমানে পুরো জেলায় ১০৭ দশমিক ৪০ একর জমিতে নেপিয়ার ঘাসের চাষ হচ্ছে। এখন কৃষকেরা ধান থেকে তেমন খড় পাচ্ছেন না। খড়ের দাম বেশি, প্রতিনিয়ত দানাদার খাদ্যের দামও বাড়ছে। এসব কারণে খড়ের বিকল্প হিসেবে ঘাসের চাহিদা বেড়েছে। কৃষক ও খামারিরা নিজেরাই ঘাস উৎপাদনে ঝুঁকেছেন। অন্যান্য ফসলের চেয়ে এখন ঘাস চাষে লাভ বেশি। প্রতিটি উপজেলাতে নেপিয়ার ঘাসের বাজারও তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যাদের জমি আছে, তারা তো ঘাস চাষ করছেন। আবার যাদের নেই, তারা বাজার থেকে ঘাস কিনে গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন। শুকনা বিচালি ও খড়ের তুলনায় সবুজ ঘাসে প্রচুর ভিটামিন রয়েছে। গরুর খাবারের চাহিদা পূরণে এই ঘাস উপকারী। এই ঘাস পশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও মাংস বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। সুস্থ-সবল পশু পালনে সবুজ ঘাসের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

– লালমনিরহাট বার্তা নিউজ ডেস্ক –